• মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭

  • || ১৮ রজব ১৪৪২

সর্বশেষ:
শুরু হলো অগ্নিঝরা মার্চ পৌরসভা নির্বাচন, পঞ্চম ধাপেও আ’লীগের জয়-জয়কার শিক্ষার প্রসারে বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ৬ মেট্রোরেলে ঢাকার যানজট মুক্তির স্বপ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ৬০ কর্মদিবস পর পরীক্ষা- শিক্ষামন্ত্রী

বাংলাদেশের পরমাণু বিজ্ঞানের পথিকৃৎ

প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী   

ভারতের পরমাণুবিজ্ঞানের জনক হিসেবে হোমিও জাহাঙ্গীর ভাবা ও পাকিস্তানের পরমাণুবিজ্ঞানের জনক ড. আব্দুল কাদির খানকে তাঁদের দেশ স্বীকৃতি প্রদান করলেও আমরা পরমাণুবিজ্ঞানের পথিকৃৎ ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পরমাণুবিজ্ঞানের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। তিনি পরমাণুশক্তিকে মানবকল্যাণের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রযুক্তি যখন মানবিক চিন্তাধারা দ্বারা তাড়িত হয়, তখন তা ইতিবাচক মৌলিক শক্তিতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর দর্শন থেকে উৎসারিত দেশপ্রেম তাঁর প্রযুক্তিচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর সঙ্গে পরমাণুশক্তির গবেষণা, সম্প্রসারণ ও ব্যবহারের জন্য যে একটা আত্মপরিচয় দরকার তা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন।

পরমাণুশক্তি নিয়ে গবেষণা করতে গেলে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতে পারে। এ বিষয়টি ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে খুব ভাবিয়েছে, তবে এর সমাধানের পথটিও তিনি বের করে এনেছেন। গবেষণারত মানুষকে তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি আণবিক শক্তি কমিশনে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। নিভৃতচারী এই মানুষটি বাংলাদেশকে পরমাণুশক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে অনেক গবেষকের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি নিজেও পরমাণু গবেষণায় সম্পৃক্ত ছিলেন। 

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া পরমাণুশক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন, তা এখন সারা বিশ্বের সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাঁর সে গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে নতুন নতুন মৌলিক ও ফলিতজ্ঞান সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে। ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালির মতো উন্নত দেশগুলোতে তিনি নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের ওপর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত গবেষণা করেছেন সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য নয়। বরং সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান ও ধারণা তিনি যাতে পরমাণুবিজ্ঞানের উৎকর্ষে কাজে লাগাতে পারেন, এটিই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। পরমাণুশক্তিতে বাংলাদেশ যাতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে এটি তিনি মনে-প্রাণে চাইতেন। উদারভাবে বিশ্বাস করতেন ও বাস্তবে তার প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন। তবে সারা পৃথিবী যখন পরমাণুশক্তিকে ধ্বংসযজ্ঞের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তখন তিনি পরমাণুশক্তিকে মানুষের কল্যাণের কাজে লাগানোর গবেষণা যেমন করেছেন, বাস্তবে তা প্রয়োগ করেও দেখিয়েছেন। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আণবিক শক্তি কমিশনের অধীনে চট্টগ্রামে রেডিয়েশন টেস্টিং ল্যাবরেটরি মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন। এই ল্যাবরেটরির মাধ্যমে বিদেশ থেকে দুধসহ যেসব খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা হয়, তাতে কোনো তেজস্ক্রিয়তা আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখা হয়।

১৯৯৭ সালে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান থাকাকালীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা আগে কেউ ভেবে দেখেননি। বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় আলোকিত হয়ে ওঠা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর পারমাণবিক ক্লাবের ৩২তম সদস্য দেশ। এটা আমাদের সবার জন্য গর্বের আর মর্যাদার। কৃষির উন্নয়নকে অন্তরে ধারণ করে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের ‘বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)’ তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে। কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। দেশের প্রয়োজনে রাজনীতি করেছেন, তবে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। বিজ্ঞানচর্চার ও নিউক্লিয়ার গবেষণার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে তাপবিদ্যা, সাম থটস অন সায়েন্স টেকনোলজি, বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিকসের ওপর গবেষণালব্ধ বই লিখছেন উদারচিত্তে।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আমাদের জাতির অমূল্য সম্পদ ও প্রেরণার উৎস। তাঁর জন্মবার্ষিকীর এই শুভ মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁকে বাংলাদেশের পরমাণুবিজ্ঞানের জনকের স্বীকৃত রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হোক।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

সূত্র: কালেরকণ্ঠ।

– দৈনিক পঞ্চগড় নিউজ ডেস্ক –