• রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩০ ১৪৩১

  • || ০৬ মুহররম ১৪৪৬

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার চোখে বর্তমান বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০২২  

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার চোখে বর্তমান বাংলাদেশ                     
মুক্তিযুদ্ধ করে একসাগর রক্ত এবং ৩০ লাখ জীবনের বিনিময়ে যে একখণ্ড ভূমি ও একটি পতাকার স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, সেই ‘স্বাধীনতা’ কথাটি একটি ভাষাসর্বস্ব শব্দ নয়, এর যথার্থতা আছে। এটি একটি অর্থবোধক শব্দ।

ইউরোপিয়ান আর্থিক দাতা সংস্থা, আইএমএফ, কনসোর্টিয়াম ব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে যে হাজার হাজার কোটি টাকা সাহায্য পাওয়া যেত, তা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আসত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তার পুরোটাই পাকিস্তানে খরচ করে ফেলত। বাঙালিদের ভাগ্যে জুটত না। মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জন করেছি এবং ঐ সব আন্তর্জাতিক অর্থসংস্থার সুফল সরাসরি পাচ্ছি। বৈদেশিক মন্ত্রণালয়সহ বিদেশের সব চাকুরে পাকিস্তানিরা নিজেদের হাতের মুঠোয় কবজা করে রাখত। দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে ঐসব চাকরির পুরোটাই এখন আমরা ভোগ করছি। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অধীনস্থ থেকে আমরা বাঙালিরা রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারতাম না, প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে শতকরা ১০ শতাংশের বেশি মন্ত্রীর পদ বাঙালিরা পেত না।

দেশ স্বাধীন হওয়ায় সব মন্ত্রিত্বের পদই বাঙালিরা অলংকৃত করছে। রাষ্ট্রদূত হতে পারতাম না, এখন সব রাষ্ট্রদূতের চাকরি আমাদের। রাষ্ট্রের অটোনোমাস, সেমি অটোনোমাস, করপোরেশন, সেক্টর করপোরেশনের প্রধান বাঙালিরা হতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধের ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ায় এখন বাঙালিরা ঐসব পদ অলংকৃত করতে পারছে। নৌবন্দরসহ সব সামুদ্রিক বন্দরের বড় বড় চাকরি, ওয়াসা, ওয়াপদাসহ সব দপ্তর, অধিদপ্তরের বড় বড় চাকরি পাকিস্তানিরা ভোগ করত আর বাঙালিরা ভোগ করত পিয়ন, চাপরাশি আর কেরানির চাকরি। মুক্তিযুদ্ধের ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ায় এখন সব চাকরির মালিক বাঙালিরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা সত্ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যার ফলে হঠাত্ করে কোনো সময় আমাদের খাদ্যাভাব দেখা দিলে আমরা ভারত থেকে তার সরবরাহ পাই এবং প্রায় সময়ই খাদ্য, মাংস ও মসলা সস্তা ও কম দামে পেয়ে থাকি। পাকিস্তানের তত্কালীন এয়ারপোর্ট এবং পিআইএ অফিসগুলোতে বাঙালিদের চাকরি দেওয়া হতো না। মুক্তিযুদ্ধের ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ায় আমরা সফলতা অর্জন করেছি এবং ঐসব চাকরি পেয়েছি। খেতের ধান পাকিস্তানের সময়ে যেখানে পাঁচ মণ উত্পাদন ছিল, স্বাধীনতার পরে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তিতে চাষাবাদ করে সেখানে এখন ধানের ফসল ফলে ৫০ মণ। আলু চাষ যেখানে হতো দু-তিনটি জেলায়, স্বাধীনতার পর আলু চাষ সারা বাংলাদেশে সব জেলায় ব্যাপক ছড়িয়ে পড়েছে এবং খাদ্যের অভাব পূরণ করতে সহায়ক হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে জাতীয় পর্যায়ে অনেক বড় আকারের ৩০টি ব্রিজ বড় নদীর ওপর হয়েছে। পাকিস্তানের অধীনস্থ থাকলে এ পর্যন্ত তিনটি ব্রিজ হতো কি না সন্দেহ। বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে যেখানে তিন-চার দিন সময় লাগত, স্বাধীনতার পর কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি উন্নতি হওয়ায় সেখানে এখন তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। দেশের অগ্রগতি এবং সামাজিক পুঁজির প্রধান সোপান দেশের বনায়ন ও বৃক্ষরাজি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় চেতনার জাগরণ আসায় মানুষের মধ্যে বৃক্ষরোপণের হিড়িক পড়ে গেছে।

পাকিস্তানের সময়ে ৭ কোটি মানুষ অভাব-অনটনে, অনাহারে এবং অর্ধাহারে দিন কাটাত। খাদ্যোত্পাদন এত কমছিল যে, বছরে ৫০ লাখ টন খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো এবং প্রতি সপ্তাহেই তিন-চারটি করে খাদ্যবাহী জাহাজ সমুদ্রবন্দরে নোঙর করত। এর ফলে বিরাট অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে যেত। মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সফলতায় নিজস্ব আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির সাহায্যে আমরা সেই একই সমান মাটিতে এখন ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যোত্পাদন করি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। ঔপনিবেশিক শোষকরা কখনো তার শোষণ করা কলোনির জন্য কোনো উন্নয়নকাজ করত না। নিজেদের জন্য উন্নয়ন করত। তাই পাকিস্তানি শোষকেরা ২২ বত্সর (১৯৪৮ থেকে ১৯৭০) বাংলাদেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ওপর ঔপনিবেশিক শোষণ চালিয়ে সেই সম্পদ দিয়ে পাকিস্তান গড়ে তুলেছিল। আমরা বাংলাদেশিরা বর্তমানে যে সফলতা অর্জন করেছি তা মুক্তিযুদ্ধের সফল ফসল স্বাধীনতা অর্জনের ফলেই করতে পেরেছি। ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারলে আমরা হয়তো-বা সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়ার সমকক্ষ হতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নিজেদের দোষের জন্য আমরা তা হতে পারিনি। সে ব্যর্থতার মূলে রয়েছে আমাদের জাতীয় দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অদক্ষতা, দলীয়করণ, অলসতা এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অপারগতা।

তবে জাতীয় অর্থনীতির দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাঘ্র না হয়ে, উদীয়মান ব্যাঘ্রের পরিচিতি লাভ করেছে, তার প্রেক্ষিতে আমাদের কিছু দুর্বল সাফল্যের স্মৃতিচারণ না করে পারি না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়করণ শিডিউল ব্যাংকগুলো বিগত কিছু বছরে পুঁজি গড়ে তুলতে পেরেছে। হাজার হাজার কোটি আইডেল মানি তাদের কাছে থাকে(সাময়িক অসুবিধার কথা ভিন্ন)। জাতীয় জরুরি এবং সরকারের জরুরি প্রয়োজনে কয়েকটি ব্যাংক ‘কলমানি’ সরবরাহের সামর্থ্য এবং সম্মান অর্জন করেছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো দেশি শিল্পোদ্যোক্তারা ছাড়াও বিদেশি শিল্পপতিদের পুঁজির সহায়তা দিয়ে থাকে। স্বাধীনতাই আমাদের এই সুফল বয়ে এনেছে। ওষুধ উত্পাদনে দেশ এক বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। অধিকাংশ আইটেমের ক্ষেত্রে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বে ওষুধ সরবরাহ ও রপ্তানি করে থাকি। যদিও জীবন রক্ষাকারী অতীব জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ এখনো আমরা আমদানি করে থাকি। মানুষের মৌলিক চাহিদা, দাবি ও অধিকার পাঁচটি—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা। দেশের ১৭ কোটি মানুষের পরিধেয় বস্ত্র উত্পাদন করার পরও পোশাকশিল্পের রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। যদিও সারা দেশে বাসস্থানের সুষম উন্নয়ন হয়নি, তবুও আশ্রয়ণ কেন্দ্র অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাসস্থান উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারিভাবে বাংলাদেশ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলেয়ে এগিয়ে চলেছে। ঢাকা এখন উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি মেগাসিটি। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত সেন্টার। আর বেশি দিন বাকি নেই ঢাকাই একদিন উপমহাদেশের সর্ববৃহত্ শহর হয়ে উঠবে। বর্তমানে পাকিস্তানিরা ঢাকায় এসে বলে, বাংলাদেশ আমাদের ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। ঢাকাকে এখন চেনাই যায় না। আদমজি বাওয়ানি, ইস্পাহানিসহ পাকিস্তানের ২২ পুঁজিপতি পরিবারকে আমরা হিংসা করতাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের ফলে ঐ ধরনের শতশত পরিবার বাঙালি জাতির মধ্যে আজ জন্ম নিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশিরা পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। ফলে এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোনসহ (ইপিজেড) হাজার হাজার বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠেছে এবং আপামর জনগণের চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে। একমাত্র ইপিজেডের পোশাকশিল্পেই লাখ লাখ ছেলেমেয়ে চাকরি করে। যার ফলে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ এ খাতে অর্জন করছে। মুক্তিযুদ্ধের ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ায় বাঙালি যুবকেরা বিদেশে চাকরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে নিজেদের পরিবারের অবস্থা ভালো করে ফেলেছে। চিংড়ি চাষ ও রপ্তানি করে বাংলাদেশ শত শত কোটি টাকা বিদেশি মুদ্রা অর্জন করছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে এবং মানুষের গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ শতাংশ শিশুকে যক্ষ্মা রোগের টিকার আওতায় এবং শতকরা ৭৭ শতাংশ শিশুকে হাম প্রতিষেধকের আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ লোক বর্তমানে বিশুদ্ধ পানি পেয়ে থাকে। ৪০ শতাংশ লোকের উন্নত পয়োনিষ্কাশন-সুবিধা রয়েছে। প্রসূতি মৃত্যুর হার বাংলাদেশ পাকিস্তানের তুলনায় অর্ধেক কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ শতকরা ৮৭ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনতে পেরেছে। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্যকে একেবারে দূর করতে পেরেছে। জনশক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নারী-পুরুষ বৈষম্য অনেক কমিয়ে এনেছে। দেশের সামাজিক উন্নয়নের সূচকটি দ্রুত সামনের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মান দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের আপামর জনসাধারণ এই সুফল ভোগ করছে। বাংলাদেশের কনটেইনার সার্ভিসে পরিবহনক্ষমতা ১০ গুণ বেড়ে গেছে। পল্লি গ্রামের এই বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ এলাকায় কেরোসিনের কুপি বাতি আর হারিকেন ছিল। এখন গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চালু হওয়ায় গ্রামের মধ্যে শহরের আমেজ চলে আসছে। যার ফলে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। এই আমাদের স্বাধীনতার বড় পাওয়া। সামনে আরো হবে নিশ্চয়ই।

লেখক: সহকারী কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা
সংসদ, জেলা কমান্ড, মুন্সীগঞ্জ।

– দৈনিক পঞ্চগড় নিউজ ডেস্ক –