• শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪ ||

  • বৈশাখ ৭ ১৪৩১

  • || ১০ শাওয়াল ১৪৪৫

সর্বশেষ:
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অন্যতম নকশাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাস, আজ ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। বন্যায় দুবাই এবং ওমানে বাংলাদেশীসহ ২১ জনের মৃত্যু। আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেল ও স্বর্ণের দাম। ইসরায়েলের হামলার পর প্রধান দুটি বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল শুরু। ইসরায়েল পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানে।

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও কর্তব্য

প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  

ভাষা হলো মানব জাতির প্রতি মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ দান। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (সূরা: আর রোম, আয়াত: ২২)

ভাষার কারণেই মানুষ অন্য সব প্রাণী থেকে ভিন্ন মর্যাদার অধিকারী। ভাষা হলো চিন্তার বাহন। মানুষ যা চিন্তা করে সেসব চিন্তা ও অনুভূতি ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করে। আর অসংখ্য ভাষার ভেতর প্রত্যেকটা মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূণ হচ্ছে তার মাতৃভাষা। জন্মের পর পর যে ভাষা সে তার আশপাশে শুনতে পায়, তার মায়ের মুখ থেকে শুনতে পায়; তাই হলো মাতৃভাষা।

ইসলামি বিশ্বাস মতে প্রতিটি ভাষাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি, ভাষার বৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। (সূরা: আর-রাহমান, আয়াত: ১-৪)
 
বাংলা, আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানি, পর্তুগিজ, চাইনিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান, রুশ ও প্রতিটি ভাষাই আল্লাহর পক্ষ থেকে। মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে অসংখ্য জাতি আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা ছিল। প্রত্যেক জাতির কাছে নবী রাসূল এসেছেন। আল্লাহ সেই নবীদের তাদের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাসি করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। (সূরা: ইব্রাহিম, আয়াত: ৪)

আরবি ভাষাকে আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা জানি। কারণ আরবি ভাষায় পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে আমাদের নবীজি (সা.) এর আগে অন্য নবীদের আরবি ভাষাভাষি করে পাঠানো হয়নি। মুসা (আ.) এর ভাষা ছিল হিব্রু, ইসা (আ.) এর ভাষা ছিল এরামিক। প্রত্যেক নবীকে তার স্বজাতির ভাষায় আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি তথা প্রত্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ তার মাতৃভাষায় আল্লাহর কথা যত সহজে বুঝতে পারবে অন্য ভাষায় সেভাবে হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। এজন্যই আল্লাহ তাআলা সূরা উব্রাহিমে এই ঘোষণা দিয়েছেন। এ থেকেই মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।

ভাষিক দক্ষতার গুরুত্ব সম্পর্কে কোরআন হাদিসে অনেক ভাষ্য আছে। নিজের ভাষায় পারদর্শিতা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি মুসা ও হারুন (আ.) এর ঘটনা থেকে। আল্লাহ তাআলা যখন মুসা (আ.)-কে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন তখন মুসা তার আপন বড় ভাই হারুনকে তার সহকারী নবী হিসেবে মনোনীত করার আবেদন করেন। মুসা (আ.) এই আবেদনের কারণ হিসেবে বলেন, হারুনের ভাষা অধিক স্পষ্ট। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে অধিক বাগ্মী, অতএব তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করুন, সে আমাকে সমর্থন করবে’। (সূরা: কাসাস, আয়াত: ৩৪)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তখন মুসা বললো, হে আমার প্রতিপালক, আমি আশঙ্কা করি যে, তারা আমাকে অস্বীকার করবে এবং আমার হৃদয় সংকুচিত হয়ে পড়ছে, আর আমার জিহবা তো সাবলীল নয়, সুতরাং হারুনের প্রতিও প্রত্যাদেশ পাঠান’। (সূরা: শুআরা, আয়াত: ১২-১৩)

আমাদের নবী মোহাম্মাদ (সা.) পৃথিবীতে মানব জাতির শেষ নবী। এই যুগটা জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগ। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভ করে। তাই আমাদের নবীজি (সা.) এর মুজেযা দেওয়া হয় ভাষা কেন্দ্রিক। পবিত্র কোরআনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ভাষা সাহিত্য ও অলংকার। কোরআন যাদের জন্য নাযিল হয়েছে তাদেরও ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

হাদিস শরিফেও আমরা লক্ষ করি যে, সাহাবিদের দৈনন্দিন কাজকর্মেও রাসূলুল্লাহ (সা.) ভাষার বিশুদ্ধতা, উপযুক্ত শব্দচয়ন ইত্যাদির প্রতি তাগিদ করেছেন। একবার জনৈক সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে আসলেন। তিনি বাহির থেকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আ-আলিজু?’ প্রবেশ করা অর্থে এই শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় ব্যবহার হয়। কিন্তু অনুমতি কিংবা প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে ‘আ-আদখুলু?’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ‘আ-আদখুলু’ বলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) এভাবে তার শব্দপ্রয়োগ ঠিক করেছেন। অথচ তা যিকির-আযকার বা এ জাতীয় কোনো কিছু ছিল না। (সহিহ মুসলিম শরিফে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফায’ নামীয় শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) শব্দপ্রয়োগ সংশোধন করেছেন।

ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা এশার নামাজকে ‘আতামা’ বলো না, বরং ‘এশা’ বলো’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ‘আঙুরকে’ ‘করম’ বলো না, ‘ইনাব’ বলো’।

আমাদের বিশেষ ভাবে মনে রাখতে হবে যে, কোনো ভাষাকে হেয় করে দেখা ঠিক নয়। বিশেষত মাতৃভাষাকে প্রত্যেক মুসলিমের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ঠিকঠাক মাতৃভাষা চর্চা না করলে মেধার পূর্ণ বিকশিত হবে না। শুধু কি তাই নিজের ভাষা আয়ত্ব না হলে আল্লাহর কাছে প্রাণ খুলে চাইতে পারবে না এবং হৃদয়ের সুকোমল বৃত্তিগুলোর বিকাশও ঘটবে না। এজন্য আমাদের সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে নিজেদের ভাষা শেখা উচিত, পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের মাতৃভাষার সঙ্গে একান্তভাবে সংযুক্ত করা উচিত।

ইয়া আল্লাহ! প্রত্যেক জাতিকে তাদের মাতৃভাষা চর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও কর্তব্যের প্রতি খেয়াল দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

– দৈনিক পঞ্চগড় নিউজ ডেস্ক –