• মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩১

  • || ১২ জ্বিলকদ ১৪৪৫

উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলেছে পঞ্চগড়ের ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনমান

প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২৩  

 
‘প্রাথমিক পর্যায়ে মিথ্যা পরিচয়ে লেখাপড়া করেছি। আমাদের জন্মনিবন্ধন করা হয়নি। এখন সব পেয়েছি। বাড়ির পাশেই কলেজে লেখাপড়া করতে পারছি। স্মার্টকার্ড দিয়ে মোবাইলের সিম তুলতে পারছি। এসব আমাদের জন্য আসলেই স্বপ্ন ছিল।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কলেজছাত্র আলমগীর হোসেন। শুধু আলমগীর হোসেন নন, এধরনের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের বাসিন্দারা।

সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে বদলে গেছে ছিটমহলের বাসিন্দারের জীবনযাত্রা। ভারতের সঙ্গে সরকারের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে ৬৮ বছরের বঞ্চনা শেষে বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হয়েছেন এসব ছিটমহলের মানুষ। এরপর তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, পাকা সড়ক, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মন্দির, মাদরাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে দেওয়া হয় আধাপাকা ঘর।

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে দেশের বিলুপ্ত ছিটমহলে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। দেশের ভূখণ্ডে যোগ হয় ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর। ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হন এসব এলাকার কয়েক হাজার মানুষ।

অন্য এলাকার মতো পঞ্চগড়ের ভূখণ্ডেও যোগ হয় ১১ হাজার ৯৩২ দশমিক ৭৮ একর এলাকা। জেলার দেবীগঞ্জ, বোদা ও সদর উপজেলার ছোট-বড় ৩৬টি ছিটমহল বিনিময় হয় দুই দেশের মধ্যে। এরপর আট বছরে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে দীর্ঘদিন অবহেলিত এখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এখন চোখে পড়ার মতো।

জেলার কয়েকটি ছিটমহল ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে একের পর এক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আট বছরে বদলে গেছে এসব এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর আট বছরে জেলার বিলুপ্ত ৩৬ ছিটমহলে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তিনটি মহাবিদ্যালয় ও একটি মাদরাাসা করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০২ কিমি পাকা সড়ক, প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ব্রিজ-কালভার্ট, ১১টি মসজিদ, চারটি মন্দির নির্মাণসহ ২৩৮ কিমি বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন এবং আট হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহলের ভূমি ও গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসনে জন্য ৩৪৯টি সেমি পাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়।

বিনিময় করা ৩৬টি ছিটমহলের মধ্যে একটি জেলা সদরের হাফিজাবাদ ইউনিয়নের ‘গারাতি ছিটমহল’। এখন এলাকাটি ‘রাজমহল’ নামে পরিচিত। এ এলাকার প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ। স্থাপন করা হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, কমিউনিটি ক্লিনিক। অথচ একসময় তাদের কোনো দেশের নাগরিকত্বই ছিল না।

গারাতি ছিটমহলের বাসিন্দা বাবুল খান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঋণ নিয়ে বড় আকারে গবাদি পশুর খামার গড়ে তুলেছি। আমার ডেইরি ফার্মে বেশকিছু যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এটা আগে কল্পনাও করা যেতো না। কারণ আমাদের কোনো নাগরিকত্ব ছিল না। ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে আমরা মানুষের মর্যাদা পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ অবদানের কথা আজীবন ভুলবো না।’

সাবেক চেয়ারম্যান মফিজার রহমান বলেন, ‘আগে আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। এখন আমরা বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক।’

বোদা উপজেলার বিলুপ্ত পুঠিমারি ছিটমহলের সাবেক চেয়ারম্যান তছলিম উদ্দিন। তার ভাষ্য, ‘ছিটমহল বিলুপ্ত ঘোষণার পরপরই আমাদের এলাকার চেহারা বদলে গেছে। আগে আমাদের এলাকাটি ভারতীয় ভূখণ্ড ছিল। এখানে বসবাসকারীদের সঙ্গে পাশের গ্রামের কেউ ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতো না। এখন আমাদের দিন বদলে গেছে। এখন আমরাও বাংলাদেশের নাগরিক।’

নাজিরগঞ্জ দইখাতা বিলুপ্ত ছিটমহলের আফির আলি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই। বিশ্ব দরবারে তিনি আমাদের মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আমরা বাংলাদেশর মধ্যে পরবাসী হিসেবে ছিলাম। নাগরিকত্ব না থাকায় কেউ আমাদের মর্যাদা দিতো না। এখন আমাদের এলাকার উন্নয়ন হয়েছে, আমরাও ভালো আছি।’

কথা হয় বিলুপ্ত শালবাড়ি ছিটমহলের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও স্বাধীন নাগরিক হতে পেরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সরকারের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে আমরা নানারকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি; যা আগে কখনো চিন্তাও করতে পারিনি। এখন আমাদের দিন বদলে গেছে। আমাদের সন্তানরা বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে নিজস্ব পরিচয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। আগে মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হতো।’
সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের স্মার্ট কাড দেওয়া হয়েছে, দেশের অন্য নাগরিকদের মতো তারা সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এটা ছোটখাটো বিষয় নয়।

তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের পরপরই ওইসব এলাকায় ২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গত আট বছরে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখনো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওইসব এলাকায় উন্নয়নকাজ চলছে।

– দৈনিক পঞ্চগড় নিউজ ডেস্ক –